ঢাকা ০৬:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ সংবাদ

বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস ও অদৃশ্য শ্রমের গল্প

কৃষি ও পরিবেশ ডেস্ক: প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস পালিত হলেও এর প্রকৃত তাৎপর্য ও ইতিহাস গ্রামীণ নারীদের বড় একটি অংশের অজানা রয়ে গেছে। কৃষি উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য দূরীকরণে গ্রামীণ নারীদের অসামান্য অবদান ও সংগ্রামকে স্বীকৃতি দিতে ২০০৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দিবসটি ঘোষিত হয়। ১৯৯৫ সালে চীনের বেইজিংয়ে চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে গ্রামীণ নারীর অদৃশ্য শ্রমের স্বীকৃতি দেওয়ার প্রথম প্রস্তাব করা হয়েছিল। দীর্ঘ এক যুগের প্রক্রিয়া শেষে ২০০৮ সালে বিশ্বজুড়ে প্রথমবারের মতো এই দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপিত হয়। বর্তমান বিশ্বে কর্মরত নারীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় ৭১ শতাংশ কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছেন।

গ্রামের নারীরা কেবল সংসার সামলানোই নয়, বরং ধান বোনা থেকে শুরু করে ফসল কাটা, মাড়াই এবং ঘরে তোলা পর্যন্ত কৃষিকাজের প্রায় প্রতিটি ধাপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পাশাপাশি বীজ সংরক্ষণ, চারা তৈরি, প্রাণিসম্পদ লালন-পালন ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনার মতো বহুমুখী কাজ করেও তারা পারিবারিক সম্পদে সমানাধিকার পান না। উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে পাওয়া অর্থের ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না এবং পরিবারের কর্তার ইচ্ছার ওপর তাদের নির্ভর করতে হয়। এছাড়া কৃষিশ্রমিক হিসেবেও তারা চরম মজুরি বৈষম্যের শিকার হন যেখানে একজন পুরুষ শ্রমিক কমপক্ষে ৫০০ টাকা পেলেও নারী শ্রমিক পান বড়জোর সাড়ে তিনশো টাকা।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী, মজুরি বৈষম্য এবং সম্পদের মালিকানা না থাকায় নারীদের পরিচালিত খামারে উৎপাদনশীলতা কমে যায়। নারীরা পুরুষের সমান সম্পদের অধিকার পেলে কৃষি উৎপাদন ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেত, যা কোটি মানুষের আহার জোগাতে পারত। বিশ্বব্যাপী কৃষিতে ৪০ শতাংশ শ্রমশক্তি নারীর হলেও মাত্র ১৫ শতাংশ নারীর হাতে কৃষিজমির মালিকানা রয়েছে। পাহাড়ি থেকে সমতলভূমি—সর্বত্র আদিবাসী নারীরা জুম চাষ ও ধান রোপণের মতো কঠোর পরিশ্রমে যুক্ত থাকলেও তাদের সেই শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন করা হয় না।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীর গৃহস্থালি শ্রমের বিশাল আর্থিক অবদান থাকলেও তা জিডিপিতে সঠিকভাবে হিসাব করা হয় না। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গৃহস্থালি শ্রমে নারীর আর্থিক অবদান ২০২৩ সালের জিডিপির ১৮.৯ শতাংশের সমান। কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থায় নারী ও পুরুষের সমমজুরি, সমান অংশগ্রহণ এবং জমির মালিকানা নিশ্চিত করা গেলে বৈশ্বিক জিডিপি বৃদ্ধির পাশাপাশি লাখ লাখ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য কোনো কৃত্রিম উদযাপন নয়, বরং গ্রামীণ নারীর অধিকার আদায়ের নীতিগত লড়াইকে বেগবান করা।

জনপ্রিয়

সিরাজগঞ্জে লুট হওয়া গ্যাস সিলিন্ডারের ৪৮টি বগুড়ায় উদ্ধার, গ্রেপ্তার ৩

বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস ও অদৃশ্য শ্রমের গল্প

প্রকাশিত ০৫:৫২:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

কৃষি ও পরিবেশ ডেস্ক: প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস পালিত হলেও এর প্রকৃত তাৎপর্য ও ইতিহাস গ্রামীণ নারীদের বড় একটি অংশের অজানা রয়ে গেছে। কৃষি উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য দূরীকরণে গ্রামীণ নারীদের অসামান্য অবদান ও সংগ্রামকে স্বীকৃতি দিতে ২০০৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দিবসটি ঘোষিত হয়। ১৯৯৫ সালে চীনের বেইজিংয়ে চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে গ্রামীণ নারীর অদৃশ্য শ্রমের স্বীকৃতি দেওয়ার প্রথম প্রস্তাব করা হয়েছিল। দীর্ঘ এক যুগের প্রক্রিয়া শেষে ২০০৮ সালে বিশ্বজুড়ে প্রথমবারের মতো এই দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপিত হয়। বর্তমান বিশ্বে কর্মরত নারীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় ৭১ শতাংশ কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছেন।

গ্রামের নারীরা কেবল সংসার সামলানোই নয়, বরং ধান বোনা থেকে শুরু করে ফসল কাটা, মাড়াই এবং ঘরে তোলা পর্যন্ত কৃষিকাজের প্রায় প্রতিটি ধাপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পাশাপাশি বীজ সংরক্ষণ, চারা তৈরি, প্রাণিসম্পদ লালন-পালন ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনার মতো বহুমুখী কাজ করেও তারা পারিবারিক সম্পদে সমানাধিকার পান না। উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে পাওয়া অর্থের ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না এবং পরিবারের কর্তার ইচ্ছার ওপর তাদের নির্ভর করতে হয়। এছাড়া কৃষিশ্রমিক হিসেবেও তারা চরম মজুরি বৈষম্যের শিকার হন যেখানে একজন পুরুষ শ্রমিক কমপক্ষে ৫০০ টাকা পেলেও নারী শ্রমিক পান বড়জোর সাড়ে তিনশো টাকা।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী, মজুরি বৈষম্য এবং সম্পদের মালিকানা না থাকায় নারীদের পরিচালিত খামারে উৎপাদনশীলতা কমে যায়। নারীরা পুরুষের সমান সম্পদের অধিকার পেলে কৃষি উৎপাদন ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেত, যা কোটি মানুষের আহার জোগাতে পারত। বিশ্বব্যাপী কৃষিতে ৪০ শতাংশ শ্রমশক্তি নারীর হলেও মাত্র ১৫ শতাংশ নারীর হাতে কৃষিজমির মালিকানা রয়েছে। পাহাড়ি থেকে সমতলভূমি—সর্বত্র আদিবাসী নারীরা জুম চাষ ও ধান রোপণের মতো কঠোর পরিশ্রমে যুক্ত থাকলেও তাদের সেই শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন করা হয় না।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীর গৃহস্থালি শ্রমের বিশাল আর্থিক অবদান থাকলেও তা জিডিপিতে সঠিকভাবে হিসাব করা হয় না। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গৃহস্থালি শ্রমে নারীর আর্থিক অবদান ২০২৩ সালের জিডিপির ১৮.৯ শতাংশের সমান। কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থায় নারী ও পুরুষের সমমজুরি, সমান অংশগ্রহণ এবং জমির মালিকানা নিশ্চিত করা গেলে বৈশ্বিক জিডিপি বৃদ্ধির পাশাপাশি লাখ লাখ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য কোনো কৃত্রিম উদযাপন নয়, বরং গ্রামীণ নারীর অধিকার আদায়ের নীতিগত লড়াইকে বেগবান করা।