আইন-আদালত ডেস্ক: গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত সহিংসতার দশক পার হলেও এখনো বিচারকাজ শুরু হয়নি। ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর উচ্ছেদের চেষ্টার সময় সংঘর্ষে তিনজন সাঁওতাল নিহত এবং বহু মানুষ আহত ও বাস্তুচ্যুত হন। দীর্ঘ এই সময়েও ঘটনার মূল অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। সিআইডির দেওয়া অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে আপত্তি ওঠার পর আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিলেও এখনো প্রতিবেদন জমা পড়েনি। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার পাওয়ার অপেক্ষা দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং তাদের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় জানা যায়, রংপুর চিনিকলের জন্য জমি অধিগ্রহণের শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ব্যাহত হলে জমি মূল মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা না করে জমি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে ইজারা দেওয়া হয়, যার ফলে সাঁওতাল ও স্থানীয় কৃষকরা ভূমি অধিকারের দাবিতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এই অমীমাংসিত ভূমিবিরোধের মধ্যেই বিতর্কিত ওই জমিতে একটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বা ইপিজেড প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্যোগ সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মাঝে নতুন করে আতঙ্ক ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক খোকন সুইটেন মুর্মুসহ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কোনো ধরনের অর্থবহ পরামর্শ ছাড়াই এই প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, পূর্বপুরুষের জমি ফিরে পাওয়ার কোনো সুরাহা না করে এই ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার আরও ক্ষুণ্ন হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে স্বীকৃত স্বাধীন ও পূর্বাবোহিত সম্মতি বা এফপিআইসি নীতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগেই ক্ষতিগ্রস্তদের মতামত ও উদ্বেগের সমাধান করা জরুরি।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের কাছে চারটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিরপেক্ষ ও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অধিকতর তদন্ত সম্পন্ন করে দায়ী ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন দেওয়া। পাশাপাশি, ভূমির রেকর্ড ও দাবিগুলো যাচাইয়ের জন্য স্বচ্ছ প্রক্রিয়া চালুর দাবি জানানো হয়েছে।
সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে তারা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের বিরোধী নন, তবে সেই উন্নয়ন যেন কোনো বঞ্চনা বা সহিংসতার ওপর প্রতিষ্ঠিত না হয়। ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করে বিতর্কিত জমিতে ইপিজেড প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই সংকট নিরসনের মাধ্যমেই রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রকৃত অঙ্গীকারের পরীক্ষা হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।





































