ঢাকা ০৯:২৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ সংবাদ

রাজশাহীর পদ্মায় ১০ বছরে দুই শতাধিক মৃত্যু, নেপথ্যে কী?

রাজশাহীর পদ্মানদীতে গত এক দশকে দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যা নদীকেন্দ্রিক নিরাপত্তার চরম ঘাটতিকে ফুটিয়ে তুলেছে। কেবল খেয়া পারাপার বা নৌকাডুবিই নয়, বরং নদীর পানিতে গোসল করতে নেমেও বহু মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। স্থানীয়দের হিসাব অনুযায়ী, একই ঘাটে এবং একই নদীর বুকে বারবার এই ধরনের প্রাণহানি ঘটলেও কার্যকর কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠছে না। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, কেবল রাজশাহী অঞ্চলেই গত পাঁচ বছরে ৬১টি নৌদুর্ঘটনায় প্রায় ৭০ থেকে ৭১ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এর মধ্যে চার জেলার পরিসংখ্যান বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে খোদ রাজশাহী জেলায়। নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্রোত ও ঘূর্ণাবর্তের তীব্রতা বাড়লেও অনেক সময় ছোট নৌকাগুলো অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে থাকে। ফলে ছোট নৌযানগুলো মাঝ নদীতে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ডুবে যায় এবং বড় ধরনের ট্রাজেডির জন্ম দেয়। সরকারি পরিসংখ্যানের বাইরেও অনেক নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান না পাওয়ায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

পদ্মার প্রায় একশ কিলোমিটার এলাকাজুরে বিস্তৃত তীরবর্তী অঞ্চলটি বর্তমানে নগরবাসীর অন্যতম প্রধান বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। রাজশাহীতে দর্শনীয় স্থান বা পর্যটনকেন্দ্রের ঘাটতি থাকায় প্রতিদিন বিকেলে ও ছুটির দিনগুলোতে হাজারো মানুষ পদ্মাপাড়ে ভিড় জমান। বিনোদনের অংশ হিসেবে নদীভ্রমণের উদ্দেশ্যে সেখানে প্রায় পাঁচ শতাধিক নৌকা চলাচল করে, যার একটি বড় অংশই ছোট আকারের ডিঙি নৌকা। এসব নৌযানের বেশিরভাগটিতেই কোনো ধরনের জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম বা লাইফ জ্যাকেট থাকে না। আবার কোনো কোনো নৌকায় জ্যাকেট থাকলেও সচেতনতার অভাবে যাত্রীরা তা ব্যবহার করতে চান না। শ্রীরামপুরসহ বেশ কিছু এলাকা ডুবুরিদের মতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও দর্শনার্থীরা অসাবচেতনভাবে নদীতে নেমে পড়েন। অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জামের অনুপস্থিতি বিনোদনের এই আনন্দ আয়োজনকে প্রায়শই মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। মাঝিরাও অনেক সময় অতিরিক্ত আয়ের লোশে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী তুলে নদীতে পাড়ি দেন, যা পরবর্তীতে বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সাম্প্রতিক বেশ কিছু দুর্ঘটনা নদীটির এই ভয়াভহ ও ঝুঁকিপূর্ণ চিত্র আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। কিছুদিন আগে নৌকাডুবির ঘটনার পর দীর্ঘ দুই দিন তল্লাশি চালিয়ে এক মাঝি ও তার তিন বছরের শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিন দিক থেকে আসা পানির স্রোতের কারণে সৃষ্ট ঘূর্ণাবর্তে পড়ে ডিঙি নৌকা ডুবে যাওয়ার মতো ঘটনা অতীতেও বহুবার ঘটেছে। স্বজনদের নিখোঁজ হওয়ার পর দীর্ঘদিন নদীর পাড়ে অপেক্ষা করা এবং শেষ পর্যন্ত কেবল লাশ পাওয়ার ঘটনাগুলো পরিবারগুলোর জীবনে অপূরণীয় শোক বয়ে আনে। নিহতদের পরিজন ও স্থানীয়রা মনে করেন, দুর্ঘটনার পর কেবল সাময়িক উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং নদীর বুকে নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে কড়া নজরদারি ও স্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। নদীর মাঝি থেকে শুরু করে সাধারণ পর্যটক—উভয় পক্ষকেই নৌপথে চলাচলের সময় যথাযথ সতর্কতা ও নিরাপত্তার নিয়ম মেনে চলতে হবে।

দুর্ঘটনা এড়াতে এবং প্রাণহানি কমাতে স্থানীয় সচেতন মানুষ ও বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ ও পরামর্শ তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, প্রতিটি ভ্রমণ নৌকায় নির্দিষ্ট সংখ্যক যাত্রী বহন নিশ্চিত করা এবং লাইফ জ্যাকেটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা উচিত। এছাড়া ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌকাগুলোর চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা, প্রশিক্ষিত মাঝি নিয়োগ দেওয়া এবং নদীর ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড স্থাপন করা প্রয়োজন। ফায়ার সার্ভিস ও নৌ-পুলিশের পক্ষ থেকেও মাঝেমধ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও জরিমানা আদায় করা হলেও তা স্থায়ী কোনো সমাধান আনতে পারছে না। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, নৌদুর্ঘটনা রোধে নিয়মিত নজরদারি এবং ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু প্রশাসনিক অভিযান নয়, বরং নদী ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের নিজ থেকে সচেতন হওয়া এবং সাঁতার না জানা শিশুদের নদী থেকে দূরে রাখার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।

জনপ্রিয়

সালমান শাহ হত্যা মামলায় ডন গ্রেপ্তারের পর নতুন কী ঘটছে?

রাজশাহীর পদ্মায় ১০ বছরে দুই শতাধিক মৃত্যু, নেপথ্যে কী?

প্রকাশিত ০৮:০৬:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজশাহীর পদ্মানদীতে গত এক দশকে দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যা নদীকেন্দ্রিক নিরাপত্তার চরম ঘাটতিকে ফুটিয়ে তুলেছে। কেবল খেয়া পারাপার বা নৌকাডুবিই নয়, বরং নদীর পানিতে গোসল করতে নেমেও বহু মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। স্থানীয়দের হিসাব অনুযায়ী, একই ঘাটে এবং একই নদীর বুকে বারবার এই ধরনের প্রাণহানি ঘটলেও কার্যকর কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠছে না। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, কেবল রাজশাহী অঞ্চলেই গত পাঁচ বছরে ৬১টি নৌদুর্ঘটনায় প্রায় ৭০ থেকে ৭১ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এর মধ্যে চার জেলার পরিসংখ্যান বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে খোদ রাজশাহী জেলায়। নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্রোত ও ঘূর্ণাবর্তের তীব্রতা বাড়লেও অনেক সময় ছোট নৌকাগুলো অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে থাকে। ফলে ছোট নৌযানগুলো মাঝ নদীতে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ডুবে যায় এবং বড় ধরনের ট্রাজেডির জন্ম দেয়। সরকারি পরিসংখ্যানের বাইরেও অনেক নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান না পাওয়ায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

পদ্মার প্রায় একশ কিলোমিটার এলাকাজুরে বিস্তৃত তীরবর্তী অঞ্চলটি বর্তমানে নগরবাসীর অন্যতম প্রধান বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। রাজশাহীতে দর্শনীয় স্থান বা পর্যটনকেন্দ্রের ঘাটতি থাকায় প্রতিদিন বিকেলে ও ছুটির দিনগুলোতে হাজারো মানুষ পদ্মাপাড়ে ভিড় জমান। বিনোদনের অংশ হিসেবে নদীভ্রমণের উদ্দেশ্যে সেখানে প্রায় পাঁচ শতাধিক নৌকা চলাচল করে, যার একটি বড় অংশই ছোট আকারের ডিঙি নৌকা। এসব নৌযানের বেশিরভাগটিতেই কোনো ধরনের জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম বা লাইফ জ্যাকেট থাকে না। আবার কোনো কোনো নৌকায় জ্যাকেট থাকলেও সচেতনতার অভাবে যাত্রীরা তা ব্যবহার করতে চান না। শ্রীরামপুরসহ বেশ কিছু এলাকা ডুবুরিদের মতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও দর্শনার্থীরা অসাবচেতনভাবে নদীতে নেমে পড়েন। অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জামের অনুপস্থিতি বিনোদনের এই আনন্দ আয়োজনকে প্রায়শই মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। মাঝিরাও অনেক সময় অতিরিক্ত আয়ের লোশে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী তুলে নদীতে পাড়ি দেন, যা পরবর্তীতে বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সাম্প্রতিক বেশ কিছু দুর্ঘটনা নদীটির এই ভয়াভহ ও ঝুঁকিপূর্ণ চিত্র আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। কিছুদিন আগে নৌকাডুবির ঘটনার পর দীর্ঘ দুই দিন তল্লাশি চালিয়ে এক মাঝি ও তার তিন বছরের শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিন দিক থেকে আসা পানির স্রোতের কারণে সৃষ্ট ঘূর্ণাবর্তে পড়ে ডিঙি নৌকা ডুবে যাওয়ার মতো ঘটনা অতীতেও বহুবার ঘটেছে। স্বজনদের নিখোঁজ হওয়ার পর দীর্ঘদিন নদীর পাড়ে অপেক্ষা করা এবং শেষ পর্যন্ত কেবল লাশ পাওয়ার ঘটনাগুলো পরিবারগুলোর জীবনে অপূরণীয় শোক বয়ে আনে। নিহতদের পরিজন ও স্থানীয়রা মনে করেন, দুর্ঘটনার পর কেবল সাময়িক উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং নদীর বুকে নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে কড়া নজরদারি ও স্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। নদীর মাঝি থেকে শুরু করে সাধারণ পর্যটক—উভয় পক্ষকেই নৌপথে চলাচলের সময় যথাযথ সতর্কতা ও নিরাপত্তার নিয়ম মেনে চলতে হবে।

দুর্ঘটনা এড়াতে এবং প্রাণহানি কমাতে স্থানীয় সচেতন মানুষ ও বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ ও পরামর্শ তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, প্রতিটি ভ্রমণ নৌকায় নির্দিষ্ট সংখ্যক যাত্রী বহন নিশ্চিত করা এবং লাইফ জ্যাকেটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা উচিত। এছাড়া ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌকাগুলোর চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা, প্রশিক্ষিত মাঝি নিয়োগ দেওয়া এবং নদীর ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড স্থাপন করা প্রয়োজন। ফায়ার সার্ভিস ও নৌ-পুলিশের পক্ষ থেকেও মাঝেমধ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও জরিমানা আদায় করা হলেও তা স্থায়ী কোনো সমাধান আনতে পারছে না। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, নৌদুর্ঘটনা রোধে নিয়মিত নজরদারি এবং ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু প্রশাসনিক অভিযান নয়, বরং নদী ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের নিজ থেকে সচেতন হওয়া এবং সাঁতার না জানা শিশুদের নদী থেকে দূরে রাখার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।