ঢাকা ১০:২৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬
সর্বশেষ সংবাদ
Logo চট্টগ্রামে সিটি কলেজে শিবিরের হামলার প্রতিবাদে কবি নজরুল কলেজ ছাত্রদলের বিক্ষোভ Logo শিক্ষকদের ডাকা শাটডাউন কর্মসূচিতে ববি শিক্ষার্থীদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া Logo জাবিতে বাস্কেটবল ক্লাবের যাত্রা শুরু, সভাপতি অক্ষর সম্পাদক নাবিলা Logo ইরানের তেল বাণিজ্য অচল করে দেওয়ার হুমকি মার্কিন মন্ত্রীর Logo সরকারের মধুচন্দ্রিমায় গ্রহণ লাগার শঙ্কা – মাহমুদুর রহমান Logo রাবিতে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার মর্টার শেল উদ্ধার  Logo অসুস্থ জীমের পাশে বাকৃবি শিক্ষার্থীরা, বৃত্তির অর্থ প্রদান Logo সংগ্রামের শহরে স্বপ্ন বুনছেন সুজন মিয়া Logo চট্টগ্রাম সিটি কলেজে ছাত্রদলের উপর হামলার প্রতিবাদে জাবিতে বিক্ষোভ মিছিল Logo “জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের আহ্বান রাবি ছাত্রদল সভাপতির”

সরকারের মধুচন্দ্রিমায় গ্রহণ লাগার শঙ্কা – মাহমুদুর রহমান

মাত্র কদিন আগে নির্বাচিত সরকারের প্রথম দুই মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। এ উপলক্ষে সরকারের তরফ থেকে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক মুখপাত্র বিএনপি সরকারের প্রথম ৬০ দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার সময়কালে যে ৬০টি সফলতার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মাত্রাতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানোর বিষয়টিও স্থান পেয়েছিল।

মুখপাত্ররা এটিকে সরকারের বিশেষ সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। অবশ্য হরিষে বিষাদের মতো করে, মধ্যাহ্নে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনের কয়েক ঘণ্টা না পেরোতেই একই দিবাগত সন্ধ্যায় জ্বালানি মন্ত্রণালয় তেলের দাম প্রকারভেদে এক লাফে লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে সরকারের মধ্যে কিছুটা সমন্বয়ের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। যারা সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন, তারা নিশ্চয়ই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানতেন না।

একেবারে সংবাদ সম্মেলনের দিনেই মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা না এলেই হয়তো সরকারের ভাবমূর্তির জন্য ভালো ছিল। উল্লেখ্য, সপ্তাহ খানেক আগে খোদ জ্বালানিমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, অন্তত এপ্রিল মাসে তেলের দাম বাড়বে না। তিনি বলেছিলেন, মে মাসে সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে তারপর দাম বাড়ানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। মন্ত্রী মহোদয় তার কথা রাখেননি কিংবা সম্ভবত আইএমএফের চাপে রাখতে পারেননি।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানো এবং ফ্যামিলি কার্ডসহ সরকারের জনতুষ্টিমূলক একাধিক প্রকল্প নিয়ে অসন্তুষ্টির কারণেই আইএমএফ ঋণের কিস্তির অর্থছাড়ে অসম্মতি জানিয়েছে। তারা বাজেটে ভর্তুকির আশঙ্কাজনক বৃদ্ধিতে আপত্তির বিষয়টি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে উত্থাপন করেছিলেন বলে শুনেছি। অর্থমন্ত্রী যদিও দাবি করেছেন, তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে আইএমএফের কোনো সম্পর্ক নেই; কিন্তু জনগণ এসব ব্যাপারে কোনো খোঁজখবর রাখে না মন্ত্রী মহোদয়ের এমন ধারণা না করাটাই উত্তম। ওয়াশিংটনের ব্যর্থ বৈঠক শেষে দেশে ফিরে তিনি স্বীকার করেছেন যে, সরকারের সঙ্গে কিছু বিষয়ে আইএমএফের মতবিরোধ রয়েছে। যাহোক, সীমিত আয়ের আমজনতা জ্বালানি তেলের পর এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ার জন্য ভয়ে ভয়ে অপেক্ষা করছে।

সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের কার্ডপ্রাপ্তির মাধ্যমে কতজন নাগরিক এখন পর্যন্ত উপকৃত হয়েছেন আমার ঠিক জানা নেই। কিন্তু জ্বালানি তেল এবং বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বোঝা প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে দেশের প্রতিটি নাগরিককে বহন করতে হবে। তদুপরি মন্ত্রীরা লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ানোটাকে ‘সামান্য মূল্যবৃদ্ধি’ হিসেবে অভিহিত করায় জনগণ অধিকতর আতঙ্কিত হয়েছে। লিটারে কত টাকা দাম বাড়লে মন্ত্রীদের বিবেচনায় সেটা আর সামান্য থাকবে না, তা আমাদের জানা নেই। তেলের দাম বাড়ার প্রতিক্রিয়ায় ইতোমধ্যে বাস এবং অন্যান্য গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধিরও দাবি উঠেছে। মূল্যবৃদ্ধির চাপে নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্তের সংসার চালানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। আরো পরিতাপের বিষয় হলো, ক্রেতারা অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করা সত্ত্বেও পেট্রোল পাম্পে চাহিদামতো জ্বালানি সরবরাহে সমস্যার কারণে হয়রানির অবসান আজ পর্যন্ত হয়নি। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, নতুন সরকারের সঙ্গে জনগণের মধুচন্দ্রিমায় হঠাৎ খানিকটা যেন ছন্দপতন ঘটে গেছে।

২০০১ সালের পর বাংলাদেশের জনগণকে গণতান্ত্রিকভাবে পছন্দের সরকার নির্বাচনের সুযোগ পেতে ২৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। এ বছর ১২ ফেব্রুয়ারি আমাদের সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে। স্বাভাবিকভাবেই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারের সঙ্গে মধুচন্দ্রিমা উপভোগে জনগণের তরফ থেকে উৎসাহের কোনো কমতি ছিল না। তারা সরকারের ভুলগুলোকে উপেক্ষা করে সাফল্যের প্রশংসা করেছে। দুর্বল স্মরণ শক্তির, অকৃতজ্ঞ বাঙালি মুসলমান জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম দুই মাসের পরিস্থিতির কথা বেমালুম ভুলে গেছে বলেই আমার ধারণা। শেখ হাসিনার দিল্লিতে পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পুলিশের একটা বড় অংশ ফ্যাসিস্ট আমলের ১৫ বছরের অপকর্মের মানসিক চাপ সইতে না পেরে এবং অপরাধের সম্ভাব্য বিচারের ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল।

সে সময় ঢাকায় মাত্র কয়েকটি থানায় ভাঙাচোরা চেয়ারটেবিলে বসে প্রয়োজনের অর্ধেক জনবল নিয়ে পুলিশের লোকজন কোনোক্রমে কাজ চালিয়ে নেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। রাজধানী এবং অন্যত্র অধিকাংশ থানা তখন পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশও না থাকায় কিশোর বয়সের ছাত্রছাত্রীদের রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছিল। অপরদিকে সুযোগ বুঝে কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী ড. ইউনূসের সরকারকে অকার্যকর করে ফেলার উদ্দেশ্যে প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো উদ্ভট দাবি নিয়ে রাস্তা বন্ধ করে বসে থাকত। অরাজকতার ক্যানসার এতটাই বিস্তার লাভ করেছিল যে, আনসারের মধ্যকার আওয়ামী দালাল গোষ্ঠী সচিবালয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে, সেখানে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুপস্থিতিতে জুলাই বিপ্লবের নেতাদের অন্যতম, বর্তমানে এনসিপিদলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জুলাইযোদ্ধা ছাত্রদের নিয়ে এসে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছিল।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল জুলাই বিপ্লবের সরকারকে প্রতিবিপ্লবের মাধ্যমে ফেলে দেওয়ার দিল্লির অব্যাহত প্রচেষ্টা। মোদির আশ্রয়ে থেকে শেখ হাসিনা অব্যাহতভাবে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে তখন বিষোদ্গার করে গেছেন। ভারতীয় মিডিয়াও হাসিনার সঙ্গে মিলে ইউনূসবিরোধী প্রচার চালিয়েছে। আমার ধারণা, ড. ইউনূস ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তির পক্ষে অভ্যন্তরীণ ও বাইরের এত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেড় বছর সরকার পরিচালনা এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর সম্ভব হতো না।

সেই সরকারও অনেক বিষয়ে ভুল করেছে। কিন্তু বিপ্লব-পরবর্তী সেই চরম অনিশ্চিত পরিস্থিতির সঙ্গে এই বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি বর্তমান সরকারের শপথ নেওয়ার দিনের মধ্যে কোনো তুলনা হতে পারে না। ৮ আগস্ট ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে অর্থনীতিসহ রাষ্ট্রের অধিকাংশ ক্ষেত্রে ড. ইউনূসের সরকার অনেকাংশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল। আমি মনে করি, সংস্কার সম্পূর্ণ করে না যাওয়াটা বিগত সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। এই অতি প্রয়োজনীয় কাজটা না করার ফলেই আজ জুলাই সনদ এবং গণভোট নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। যাকগে, সেটা ভিন্ন আলোচনা।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, জুলাই বিপ্লব এবং ড. ইউনূস সরকারের শাসনামলের প্রধান সুবিধাভোগী ক্ষমতাসীন দল বিএনপি হওয়া সত্ত্বেও টেলিভিশন টকশোতে তাদের সমর্থকরা প্রায়ই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কঠোর সমালোচনা করে থাকেন। এই সমালোচকদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ অবশ্য গুপ্ত বাকশালি এবং শাহবাগি গোষ্ঠী। এই ভারতীয় দালাল গোষ্ঠী জুলাই বিপ্লব এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে মন থেকে কখনো মেনে নিতে পারেনি। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে বিএনপিতে আশ্রয় নিয়ে এরা প্রকৃতপক্ষে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় দিন গুনছে। এদের বহুরূপী চরিত্র আমি বুঝতে পারি।

কিন্তু শহীদ জিয়ার প্রকৃত অনুসারীদের ইউনূস সরকারের সমালোচনার ক্ষেত্রে আরো সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। বাকশালি চেতনার অনুপ্রবেশ দ্বারা তারা বিভ্রান্ত ও আদর্শচ্যুত হচ্ছেন কি না, সে ব্যাপারে ভালোমতো চিন্তাভাবনা করে তবেই গণমাধ্যমে মন্তব্য করা বাঞ্ছনীয়। কয়েকটি জাতীয় পত্রিকাতেও এমন ভাষায় ড. ইউনূস এবং অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সমালোচনা করা হচ্ছে, যাতে মনে হতে পারে যে, জুলাই বিপ্লবে হাসিনার সরকার নয়, বরং ইউনূস সরকারের পতন ঘটেছিল। জুলাই বিপ্লবে আমাদের সাহসী ও দেশপ্রেমিক তরুণদের শাহাদাতের বিনিময়ে এ বছর ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের গণতন্ত্রে যে প্রত্যাবর্তন ঘটেছে, জনগণের একান্ত প্রত্যাশা সেটা যেন স্থায়ী রূপ পায়। সেই আশা পূরণে সর্বাধিক দায়িত্ব অবশ্যই সরকারের।

আমরা আশা করি, সরকার স্বচ্ছতার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। শ্রুতিকটু চাটুকারিতা এবং অপ্রয়োজনীয় অতিপ্রচারের কোনো প্রয়োজন নেই। গণভবনের সব কথিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা ও সাংবাদিক নামধারী দালালরা চাটুকারিতার নির্লজ্জ চেহারা আমাদের দেখিয়ে গেছেন। সেই চাটুকারিতা শেখ হাসিনাকে জনপ্রিয়তাও দেয়নি এবং পতন থেকে রক্ষাও করতে পারেনি। বর্তমান সরকারের সৌভাগ্য যে, এখন পর্যন্ত মূলধারার গণমাধ্যম সরকারের সমালোচনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সংযমের পরিচয় দিয়েছে। মোটা দাগে সংবাদমাধ্যম সরকারি দলকে সমর্থন করেছে বলা যেতে পারে। সুতরাং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমালোচনা নিয়ে সরকারের মধ্যকার প্রভাবশালীরা মাঝেমধ্যে যে ক্ষমতার চর্চা করছেন, সেটা অপ্রয়োজনীয় বলেই আমি মনে করি। এসব প্রভাবশালীর অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে আমার পরিচিত।

তাদের প্রতি জনগণের ও মিডিয়ার সদিচ্ছা নষ্ট না করার পরামর্শ থাকল। সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় থাকা উচিত যে, তাদের, রাষ্ট্রের এবং জনগণের প্রধান শত্রু পতিত ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ। জনগণ কিন্তু সাধারণভাবে ড. ইউনূস সরকারকে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী বলেই মনে করে। বিশেষ করে সেই সরকারের প্রভাবশালী নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং অ্যাটর্নি জেনারেল বর্তমান সরকারের অধিকতর প্রভাবশালী মন্ত্রী হওয়ায় জনগণের সেই ধারণা আরো পাকাপোক্ত হয়েছে। এছাড়া জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও জুলাই বিপ্লবের পটভূমিতে আওয়ামী লীগের মতো শত্রু হিসেবে পরিগণিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক নাগরিকরা বিএনপি, এনসিপি এবং জামায়াতে ইসলামী— তিন দলকেই জুলাই বিপ্লবের সহযোদ্ধা হিসেবে বিবেচনা করে। সুতরাং সরকার যদি নিজেদের স্বার্থে মধুচন্দ্রিমা দীর্ঘায়িত করতে চায়, তাহলে তাদের অবশ্যই রাজনৈতিক শত্রুমিত্র নির্ধারণ সঠিকভাবে করতে হবে।

সূত্র : আমার দেশ

জনপ্রিয়

চট্টগ্রামে সিটি কলেজে শিবিরের হামলার প্রতিবাদে কবি নজরুল কলেজ ছাত্রদলের বিক্ষোভ

সরকারের মধুচন্দ্রিমায় গ্রহণ লাগার শঙ্কা – মাহমুদুর রহমান

প্রকাশিত ১১:৫৭:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬

মাত্র কদিন আগে নির্বাচিত সরকারের প্রথম দুই মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। এ উপলক্ষে সরকারের তরফ থেকে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক মুখপাত্র বিএনপি সরকারের প্রথম ৬০ দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার সময়কালে যে ৬০টি সফলতার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মাত্রাতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানোর বিষয়টিও স্থান পেয়েছিল।

মুখপাত্ররা এটিকে সরকারের বিশেষ সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। অবশ্য হরিষে বিষাদের মতো করে, মধ্যাহ্নে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনের কয়েক ঘণ্টা না পেরোতেই একই দিবাগত সন্ধ্যায় জ্বালানি মন্ত্রণালয় তেলের দাম প্রকারভেদে এক লাফে লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে সরকারের মধ্যে কিছুটা সমন্বয়ের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। যারা সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন, তারা নিশ্চয়ই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানতেন না।

একেবারে সংবাদ সম্মেলনের দিনেই মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা না এলেই হয়তো সরকারের ভাবমূর্তির জন্য ভালো ছিল। উল্লেখ্য, সপ্তাহ খানেক আগে খোদ জ্বালানিমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, অন্তত এপ্রিল মাসে তেলের দাম বাড়বে না। তিনি বলেছিলেন, মে মাসে সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে তারপর দাম বাড়ানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। মন্ত্রী মহোদয় তার কথা রাখেননি কিংবা সম্ভবত আইএমএফের চাপে রাখতে পারেননি।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানো এবং ফ্যামিলি কার্ডসহ সরকারের জনতুষ্টিমূলক একাধিক প্রকল্প নিয়ে অসন্তুষ্টির কারণেই আইএমএফ ঋণের কিস্তির অর্থছাড়ে অসম্মতি জানিয়েছে। তারা বাজেটে ভর্তুকির আশঙ্কাজনক বৃদ্ধিতে আপত্তির বিষয়টি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে উত্থাপন করেছিলেন বলে শুনেছি। অর্থমন্ত্রী যদিও দাবি করেছেন, তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে আইএমএফের কোনো সম্পর্ক নেই; কিন্তু জনগণ এসব ব্যাপারে কোনো খোঁজখবর রাখে না মন্ত্রী মহোদয়ের এমন ধারণা না করাটাই উত্তম। ওয়াশিংটনের ব্যর্থ বৈঠক শেষে দেশে ফিরে তিনি স্বীকার করেছেন যে, সরকারের সঙ্গে কিছু বিষয়ে আইএমএফের মতবিরোধ রয়েছে। যাহোক, সীমিত আয়ের আমজনতা জ্বালানি তেলের পর এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ার জন্য ভয়ে ভয়ে অপেক্ষা করছে।

সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের কার্ডপ্রাপ্তির মাধ্যমে কতজন নাগরিক এখন পর্যন্ত উপকৃত হয়েছেন আমার ঠিক জানা নেই। কিন্তু জ্বালানি তেল এবং বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বোঝা প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে দেশের প্রতিটি নাগরিককে বহন করতে হবে। তদুপরি মন্ত্রীরা লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ানোটাকে ‘সামান্য মূল্যবৃদ্ধি’ হিসেবে অভিহিত করায় জনগণ অধিকতর আতঙ্কিত হয়েছে। লিটারে কত টাকা দাম বাড়লে মন্ত্রীদের বিবেচনায় সেটা আর সামান্য থাকবে না, তা আমাদের জানা নেই। তেলের দাম বাড়ার প্রতিক্রিয়ায় ইতোমধ্যে বাস এবং অন্যান্য গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধিরও দাবি উঠেছে। মূল্যবৃদ্ধির চাপে নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্তের সংসার চালানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। আরো পরিতাপের বিষয় হলো, ক্রেতারা অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করা সত্ত্বেও পেট্রোল পাম্পে চাহিদামতো জ্বালানি সরবরাহে সমস্যার কারণে হয়রানির অবসান আজ পর্যন্ত হয়নি। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, নতুন সরকারের সঙ্গে জনগণের মধুচন্দ্রিমায় হঠাৎ খানিকটা যেন ছন্দপতন ঘটে গেছে।

২০০১ সালের পর বাংলাদেশের জনগণকে গণতান্ত্রিকভাবে পছন্দের সরকার নির্বাচনের সুযোগ পেতে ২৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। এ বছর ১২ ফেব্রুয়ারি আমাদের সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে। স্বাভাবিকভাবেই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারের সঙ্গে মধুচন্দ্রিমা উপভোগে জনগণের তরফ থেকে উৎসাহের কোনো কমতি ছিল না। তারা সরকারের ভুলগুলোকে উপেক্ষা করে সাফল্যের প্রশংসা করেছে। দুর্বল স্মরণ শক্তির, অকৃতজ্ঞ বাঙালি মুসলমান জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম দুই মাসের পরিস্থিতির কথা বেমালুম ভুলে গেছে বলেই আমার ধারণা। শেখ হাসিনার দিল্লিতে পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পুলিশের একটা বড় অংশ ফ্যাসিস্ট আমলের ১৫ বছরের অপকর্মের মানসিক চাপ সইতে না পেরে এবং অপরাধের সম্ভাব্য বিচারের ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল।

সে সময় ঢাকায় মাত্র কয়েকটি থানায় ভাঙাচোরা চেয়ারটেবিলে বসে প্রয়োজনের অর্ধেক জনবল নিয়ে পুলিশের লোকজন কোনোক্রমে কাজ চালিয়ে নেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। রাজধানী এবং অন্যত্র অধিকাংশ থানা তখন পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশও না থাকায় কিশোর বয়সের ছাত্রছাত্রীদের রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছিল। অপরদিকে সুযোগ বুঝে কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী ড. ইউনূসের সরকারকে অকার্যকর করে ফেলার উদ্দেশ্যে প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো উদ্ভট দাবি নিয়ে রাস্তা বন্ধ করে বসে থাকত। অরাজকতার ক্যানসার এতটাই বিস্তার লাভ করেছিল যে, আনসারের মধ্যকার আওয়ামী দালাল গোষ্ঠী সচিবালয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে, সেখানে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুপস্থিতিতে জুলাই বিপ্লবের নেতাদের অন্যতম, বর্তমানে এনসিপিদলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জুলাইযোদ্ধা ছাত্রদের নিয়ে এসে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছিল।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল জুলাই বিপ্লবের সরকারকে প্রতিবিপ্লবের মাধ্যমে ফেলে দেওয়ার দিল্লির অব্যাহত প্রচেষ্টা। মোদির আশ্রয়ে থেকে শেখ হাসিনা অব্যাহতভাবে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে তখন বিষোদ্গার করে গেছেন। ভারতীয় মিডিয়াও হাসিনার সঙ্গে মিলে ইউনূসবিরোধী প্রচার চালিয়েছে। আমার ধারণা, ড. ইউনূস ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তির পক্ষে অভ্যন্তরীণ ও বাইরের এত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেড় বছর সরকার পরিচালনা এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর সম্ভব হতো না।

সেই সরকারও অনেক বিষয়ে ভুল করেছে। কিন্তু বিপ্লব-পরবর্তী সেই চরম অনিশ্চিত পরিস্থিতির সঙ্গে এই বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি বর্তমান সরকারের শপথ নেওয়ার দিনের মধ্যে কোনো তুলনা হতে পারে না। ৮ আগস্ট ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে অর্থনীতিসহ রাষ্ট্রের অধিকাংশ ক্ষেত্রে ড. ইউনূসের সরকার অনেকাংশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল। আমি মনে করি, সংস্কার সম্পূর্ণ করে না যাওয়াটা বিগত সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। এই অতি প্রয়োজনীয় কাজটা না করার ফলেই আজ জুলাই সনদ এবং গণভোট নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। যাকগে, সেটা ভিন্ন আলোচনা।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, জুলাই বিপ্লব এবং ড. ইউনূস সরকারের শাসনামলের প্রধান সুবিধাভোগী ক্ষমতাসীন দল বিএনপি হওয়া সত্ত্বেও টেলিভিশন টকশোতে তাদের সমর্থকরা প্রায়ই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কঠোর সমালোচনা করে থাকেন। এই সমালোচকদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ অবশ্য গুপ্ত বাকশালি এবং শাহবাগি গোষ্ঠী। এই ভারতীয় দালাল গোষ্ঠী জুলাই বিপ্লব এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে মন থেকে কখনো মেনে নিতে পারেনি। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে বিএনপিতে আশ্রয় নিয়ে এরা প্রকৃতপক্ষে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় দিন গুনছে। এদের বহুরূপী চরিত্র আমি বুঝতে পারি।

কিন্তু শহীদ জিয়ার প্রকৃত অনুসারীদের ইউনূস সরকারের সমালোচনার ক্ষেত্রে আরো সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। বাকশালি চেতনার অনুপ্রবেশ দ্বারা তারা বিভ্রান্ত ও আদর্শচ্যুত হচ্ছেন কি না, সে ব্যাপারে ভালোমতো চিন্তাভাবনা করে তবেই গণমাধ্যমে মন্তব্য করা বাঞ্ছনীয়। কয়েকটি জাতীয় পত্রিকাতেও এমন ভাষায় ড. ইউনূস এবং অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সমালোচনা করা হচ্ছে, যাতে মনে হতে পারে যে, জুলাই বিপ্লবে হাসিনার সরকার নয়, বরং ইউনূস সরকারের পতন ঘটেছিল। জুলাই বিপ্লবে আমাদের সাহসী ও দেশপ্রেমিক তরুণদের শাহাদাতের বিনিময়ে এ বছর ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের গণতন্ত্রে যে প্রত্যাবর্তন ঘটেছে, জনগণের একান্ত প্রত্যাশা সেটা যেন স্থায়ী রূপ পায়। সেই আশা পূরণে সর্বাধিক দায়িত্ব অবশ্যই সরকারের।

আমরা আশা করি, সরকার স্বচ্ছতার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। শ্রুতিকটু চাটুকারিতা এবং অপ্রয়োজনীয় অতিপ্রচারের কোনো প্রয়োজন নেই। গণভবনের সব কথিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা ও সাংবাদিক নামধারী দালালরা চাটুকারিতার নির্লজ্জ চেহারা আমাদের দেখিয়ে গেছেন। সেই চাটুকারিতা শেখ হাসিনাকে জনপ্রিয়তাও দেয়নি এবং পতন থেকে রক্ষাও করতে পারেনি। বর্তমান সরকারের সৌভাগ্য যে, এখন পর্যন্ত মূলধারার গণমাধ্যম সরকারের সমালোচনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সংযমের পরিচয় দিয়েছে। মোটা দাগে সংবাদমাধ্যম সরকারি দলকে সমর্থন করেছে বলা যেতে পারে। সুতরাং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমালোচনা নিয়ে সরকারের মধ্যকার প্রভাবশালীরা মাঝেমধ্যে যে ক্ষমতার চর্চা করছেন, সেটা অপ্রয়োজনীয় বলেই আমি মনে করি। এসব প্রভাবশালীর অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে আমার পরিচিত।

তাদের প্রতি জনগণের ও মিডিয়ার সদিচ্ছা নষ্ট না করার পরামর্শ থাকল। সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় থাকা উচিত যে, তাদের, রাষ্ট্রের এবং জনগণের প্রধান শত্রু পতিত ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ। জনগণ কিন্তু সাধারণভাবে ড. ইউনূস সরকারকে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী বলেই মনে করে। বিশেষ করে সেই সরকারের প্রভাবশালী নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং অ্যাটর্নি জেনারেল বর্তমান সরকারের অধিকতর প্রভাবশালী মন্ত্রী হওয়ায় জনগণের সেই ধারণা আরো পাকাপোক্ত হয়েছে। এছাড়া জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও জুলাই বিপ্লবের পটভূমিতে আওয়ামী লীগের মতো শত্রু হিসেবে পরিগণিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক নাগরিকরা বিএনপি, এনসিপি এবং জামায়াতে ইসলামী— তিন দলকেই জুলাই বিপ্লবের সহযোদ্ধা হিসেবে বিবেচনা করে। সুতরাং সরকার যদি নিজেদের স্বার্থে মধুচন্দ্রিমা দীর্ঘায়িত করতে চায়, তাহলে তাদের অবশ্যই রাজনৈতিক শত্রুমিত্র নির্ধারণ সঠিকভাবে করতে হবে।

সূত্র : আমার দেশ