একসময় রোগ নির্মূলের ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় অগ্রগতি অর্জন করলেও বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক হাম প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, চলতি বছর মার্চে এই রোগের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে দেশজুড়ে সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় এক হাজারে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে হামের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে বাংলাদেশে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এই সময়ের মধ্যে ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি মানুষ সন্দেহভাজন হাম রোগী হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন এবং বিপুলসংখ্যক শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে দেশের চিকিৎসালয়গুলো।
বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, বিগত বছরগুলোতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন ঘটার কারণে শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়টাতে টিকাদান কার্যক্রমে স্থবিরতা এবং টিকা সংগ্রহের নীতিতে পরিবর্তন আসায় সাপ্লাই চেইনে বড় ধরনের সংকট দেখা দেয়। এর ফলে লাখ লাখ শিশু হামের টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়, যার মধ্যে নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে, বিভিন্ন টিকাদান কর্মসূচি স্থগিত ও বাতিল করার ফলে এই সুরক্ষার প্রাচীর ভেঙে পড়েছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে এই ব্যাঘাত ঘটার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এদিকে রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা বর্তমানে চরম বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করায় হাসপাতালগুলোতে দ্বিমুখী চাপের সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন বড় হাসপাতালের চিত্র অত্যন্ত সংকটজনক; যেমন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে ধারণক্ষমতার তুলনায় দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকায় অনেক শিশুকে মেঝেতে শুইয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া হামের চিকিৎসায় অত্যন্ত জরুরি শিশুদের স্যালাইনের তীব্র সংকটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে, রোগীর এই বিপুল স্রোত সামাল দেওয়া এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা তাদের জন্য অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রাদুর্ভাবের প্রভাব কমাতে চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে একটি জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কেবল এই জরুরি উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করার তাগিদ দিয়েছেন। একইসঙ্গে যারা সময়মতো টিকা পায়নি তাদের জন্য বিশেষ ক্যাচ-আপ কর্মসূচি চালুর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জোর চেষ্টা চলছে, তবে শিশুদের প্রাণহানি ও দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে দেশজুড়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।




































