ঢাকা ০৭:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

হুতি কারা, কী চায় তারা?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর লড়াইয়ে দেশটিতে নতুন করে সহিংসতা মাথাচাড়া দিয়েছে। লোহিত সাগরের কৌশলগত প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালীর তীরবর্তী উপকূল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর গত অক্টোবরে সৌদি বিমান হামলার সহায়তায় বড় ধরনের পাল্টা অভিযান চালায় ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী। এই বিমান হামলার জবাবে হুতিরা প্রতিবেশী সৌদি আরবের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি স্থাপনা ও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা জোরদার করেছে। সাম্প্রতিক এই সহিংসতায় শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন এবং জাতিসংঘের হিসাবে নতুন করে দুই লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

হুতি মূলত উত্তর ইয়েমেনের একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠী, যারা শিয়া ইসলামের জায়দি মতাবলম্বীদের স্বার্থরক্ষায় লড়াই করে আসছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আনসারুল্লাহ’ নামে পরিচিত। ১৯৯০-এর দশকে হুসেইন আল-হুতির হাতে এই আন্দোলনের সূচনা হয় এবং ২০০৪ সাল থেকে আব্দুল মালিক আল-হুতি গোষ্ঠীটির শীর্ষ নেতার দায়িত্ব পালন করছেন। হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলোর পাশাপাশি হুতিরাও নিজেদের ইরান-নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধের অক্ষ’-এর অংশ বলে মনে করে। ২০১১ সালের ‘আরব বসন্ত’-এর পর ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকটের সুযোগ নিয়ে ২০১৪ সালে তারা রাজধানী সানা এবং পরবর্তীতে দেশটির বিশাল অঞ্চল দখল করে নেয়।

সানায় সরকারের পতনের পর হুতিরা পুরো ইয়েমেন দখল করে দেশটিকে ইরানের পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে—এই আশঙ্কায় ২০১৫ সালে জোট গঠন করে বিমান হামলা শুরু করে সৌদি আরব। তবে বছরের পর বছর হামলা সত্ত্বেও দখল করা এলাকাগুলো থেকে হুতিদের হঠাতে পারেনি জোট এবং জাতিসংঘের তথ্যমতে এই যুদ্ধে দেড় লাখের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে এবং গাজা যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে হুতিরা লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক জাহাজে ও ইসরায়েলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আসছে। হুতিদের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলও তাদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা পরিচালনা করেছে।

হুতিদের এসব কর্মকাণ্ড বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য বাব আল-মান্দেব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুটে পরিণত হয়েছে, যা বর্তমানে এই সংঘাতের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এছাড়া সৌদি বিমানবন্দর এবং তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হুতিদের লাগাতার হামলা আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইয়েমেনের মোট জনসংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ হুতি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে বসবাস করায় এই সংঘাত দেশটির দীর্ঘমেয়াদী মানবিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।

জনপ্রিয়

রূপকথার ডাইনিরা কেন ঝাড়ুতে চড়ে উড়ে বেড়ায়?

হুতি কারা, কী চায় তারা?

প্রকাশিত ০৫:৫২:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর লড়াইয়ে দেশটিতে নতুন করে সহিংসতা মাথাচাড়া দিয়েছে। লোহিত সাগরের কৌশলগত প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালীর তীরবর্তী উপকূল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর গত অক্টোবরে সৌদি বিমান হামলার সহায়তায় বড় ধরনের পাল্টা অভিযান চালায় ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী। এই বিমান হামলার জবাবে হুতিরা প্রতিবেশী সৌদি আরবের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি স্থাপনা ও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা জোরদার করেছে। সাম্প্রতিক এই সহিংসতায় শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন এবং জাতিসংঘের হিসাবে নতুন করে দুই লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

হুতি মূলত উত্তর ইয়েমেনের একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠী, যারা শিয়া ইসলামের জায়দি মতাবলম্বীদের স্বার্থরক্ষায় লড়াই করে আসছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আনসারুল্লাহ’ নামে পরিচিত। ১৯৯০-এর দশকে হুসেইন আল-হুতির হাতে এই আন্দোলনের সূচনা হয় এবং ২০০৪ সাল থেকে আব্দুল মালিক আল-হুতি গোষ্ঠীটির শীর্ষ নেতার দায়িত্ব পালন করছেন। হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলোর পাশাপাশি হুতিরাও নিজেদের ইরান-নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধের অক্ষ’-এর অংশ বলে মনে করে। ২০১১ সালের ‘আরব বসন্ত’-এর পর ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকটের সুযোগ নিয়ে ২০১৪ সালে তারা রাজধানী সানা এবং পরবর্তীতে দেশটির বিশাল অঞ্চল দখল করে নেয়।

সানায় সরকারের পতনের পর হুতিরা পুরো ইয়েমেন দখল করে দেশটিকে ইরানের পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে—এই আশঙ্কায় ২০১৫ সালে জোট গঠন করে বিমান হামলা শুরু করে সৌদি আরব। তবে বছরের পর বছর হামলা সত্ত্বেও দখল করা এলাকাগুলো থেকে হুতিদের হঠাতে পারেনি জোট এবং জাতিসংঘের তথ্যমতে এই যুদ্ধে দেড় লাখের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে এবং গাজা যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে হুতিরা লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক জাহাজে ও ইসরায়েলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আসছে। হুতিদের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলও তাদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা পরিচালনা করেছে।

হুতিদের এসব কর্মকাণ্ড বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য বাব আল-মান্দেব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুটে পরিণত হয়েছে, যা বর্তমানে এই সংঘাতের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এছাড়া সৌদি বিমানবন্দর এবং তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হুতিদের লাগাতার হামলা আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইয়েমেনের মোট জনসংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ হুতি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে বসবাস করায় এই সংঘাত দেশটির দীর্ঘমেয়াদী মানবিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।