ফিচার ডেস্ক: প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গগের ১৮৮৯ সালে আঁকা বিশ্ববিখ্যাত ক্যানভাস ‘স্টারি নাইট’-এর রাতের আকাশের মূল রহস্য খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছেন গবেষকরা। এতদিন ধরে ছবিটিতে যে তারামণ্ডলী ফুটিয়ে তোলার কথা ভাবা হতো, আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় পরিচালিত নতুন গবেষণায় তার ভিন্ন বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পদ্ধতি ও তথ্য বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হয়েছেন যে, চিত্রকর্মটিতে মূলত ফ্রান্সের সাঁ-রেমি এলাকার একটি নির্দিষ্ট রাতের ভোর হওয়ার আগের আকাশ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই চিত্রকর্মের পেছনের আকাশ গণনার চেষ্টা করলেও আগের গবেষণাগুলোর ফলাফল পরস্পরবিরোধী ছিল।
আগের গবেষণাগুলোর পরস্পরবিরোধী ফলাফলের কারণে দর্শক ও গবেষকরা ছবিটির বাস্তব রূপের চেয়ে এর রূপক বা প্রতীকী ব্যাখ্যার ওপর বেশি মনোযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়ার কিউং হি ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক এবং এই গবেষণার প্রধান এলিয়াহ জং-হিউন কিম বিষয়টিকে অপর্যাপ্ত মনে করে নতুন করে অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেন। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চিত্রকর্মের উজ্জ্বল তারামণ্ডলটি আসলে মেষ রাশি নয়, বরং বৃষ রাশির হায়াডিস তারামণ্ডলী। ফ্রান্সে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ এবং নতুন ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষকরা এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।
অতীতে ১৮৮৯ সালের ১৮ জুন ভ্যান গগের লেখা একটি চিঠির ওপর ভিত্তি করে চিত্রকর্মটির সময়কাল নির্ধারণ করা হতো, যার সঙ্গে বাস্তব আকাশের চাঁদের মিল পাওয়া যেত না। চিঠিতে উল্লিখিত সময়ে বাস্তবে চাঁদ প্রায় গোলাকার থাকলেও ছবিতে তা সরু কাস্তের মতো আঁকা হয়েছিল। তবে গবেষকদের নতুন বিশ্লেষণ বলছে, একই বছরের ২২ জুলাই রাতের আকাশের সঙ্গে ছবিটির নিখুঁত মিল রয়েছে। ওই দিন রাতের শেষ ভাগে আকাশে ক্ষীয়মাণ একফালি চাঁদ, শুক্র গ্রহ ও বৃষ রাশির হায়াডিস তারামণ্ডলী খুব কাছাকাছি অবস্থান করেছিল।
সে সময় চিত্রশিল্পী ভ্যান গগ অসুস্থ ও মৃগী রোগে আক্রান্ত থাকায় গবেষকরা প্রথমে ২২ জুলাইয়ের সময়কালটি বিবেচনায় নিতে দ্বিধা করেছিলেন। পরবর্তীতে ভ্যান গগের চিঠি, আবহাওয়ার তৎকালীন রেকর্ড এবং কীটপতঙ্গসংক্রান্ত মন্তব্যের ওপর গভীর বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ চালিয়ে তারা নিশ্চিত হন যে ছবিটি জুলাইয়ের শেষদিকেই আঁকা হয়েছিল। এমনকি চিত্রকর্মটি ঠিক কোন জায়গায় বসে আঁকা হয়েছিল, সেই নির্দিষ্ট স্থানটিও শনাক্ত করেছেন তারা। বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকদের প্রত্যাশা, এই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সাঁ-রেমি এলাকায় আঁকা চিত্রকর্মগুলোর ধারাবাহিকতা এবং ভ্যান গগের কাজের ধরন নিয়ে নতুন গবেষণার পথ উন্মুক্ত করবে। চিত্রশিল্পীর আঁকা অন্যান্য ক্যানভাসের আকাশ নিয়েও এমন বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা ও বিশ্লেষণ অব্যাহত রয়েছে। এই গবেষণার মাধ্যমে বিখ্যাত শিল্পকর্মটির পেছনের ঐতিহাসিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সত্যতা নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে। শিল্প ও বিজ্ঞানের এই মেলবন্ধন ভবিষ্যতে শিল্পবোদ্ধাদের কাছে ভ্যান গগের কাজকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে বুঝতে সাহায্য করবে।






































