পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশে সহিংসতার মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট তৈরি করেছে। বিগত প্রায় দুই দশক ধরে প্রদেশটিতে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সশস্ত্র বিদ্রোহ চলমান থাকলেও, এতদিন এর পশতুন-অধ্যুষিত উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলো তুলনামূলক শান্ত ও নিরাপদ ছিল। কিন্তু সম্প্রতি পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে এবং পশতুন অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো এখন নতুন করে হামলার প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। গবেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, টিটিপি বা পাকিস্তানি তালেবান এবং বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই পুরো অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে।
চলতি বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে এই সহিংসতার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় বড় ধরনের সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি পিশিন জেলার জিয়ারাত ক্রস এলাকায় একটি কাস্টমস স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা চালায় টিটিপি, যা প্রতিহত করতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও কাস্টমস কর্মীসহ বেশ কয়েকজন প্রাণ হারান। এর কিছুদিন পর কোয়েটার উপকণ্ঠে শাবান এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক টিটিপি সদস্য নিহত হয়। একই সময়ে জিয়ারাত থেকে ফেরার পথে একটি আধাসামরিক বাহিনীর গাড়িবহরে ভয়াবহ হামলার দায় স্বীকার করে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ), যাতে ডজনখানেক সেনা সদস্য নিহত হন। নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, বেলুচিস্তান এখন পাকিস্তানের সবচেয়ে বেশি সহিংসতাপ্রবণ প্রদেশে পরিণত হয়েছে এবং পার্শ্ববর্তী খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের চেয়েও এখানকার পরিস্থিতি এখন অনেক বেশি প্রাণঘাতী।
প্রদেশটির এই হঠাৎ অবনতিশীল পরিস্থিতির পেছনে বিভিন্ন কৌশলগত ও ভৌগোলিক কারণ রয়েছে বলে মনে করেন নীতিবিশ্লেষকরা। খাইবার পাখতুনখাওয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযานের মুখে অনেক সশস্ত্র যোদ্ধা বেলুচিস্তানের দিকে চলে আসে বলে ধারণা করা হয়। বিশেষ করে ঝোব ও জিয়ারাতকে খাইবার পাখতুনখাওয়ার দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের সঙ্গে যুক্তকারী এন-৫০ মহাসড়কটি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর যাতায়াত ও কর্মকাণ্ডের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাছাড়া, বিএলএর প্রথাগত প্রভাব বলয়ের বাইরে গিয়ে এসব এলাকায় হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন তাদের ভৌগোলিক বিস্তারকে স্পষ্ট করে। যদিও টিটিপি এবং বিএলএর মধ্যে সরাসরি কোনো কৌশলগত সমন্বয় বা সহযোগিতা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তবে উভয় পক্ষই নিজেদের মতো করে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছে।
এই সহিংসতার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বেলুচিস্তানের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য, পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক জীবনের ওপর। ইরান সীমান্ত সংলগ্ন এবং করাচি অভিমুখী প্রধান বাণিজ্যিক মহাসড়কগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত না থাকায় পণ্যবাহী ট্রাকের চালকেরা যাতায়াত করতে ভয় পাচ্ছেন। ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, একের পর এক পণ্যবাহী ট্রাকে আগুন দেওয়ার ঘটনা এবং চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণে কোয়েটার সিংহভাগ ব্যবসা প্রায় বন্ধের উপক্রম হয়েছে। তাছাড়া, পশতুন অধ্যুষিত এই জনপদে পুলিশের অপর্যাপ্ত সহায়তা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির অভিযোগে স্থানীয় জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলো তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে। কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এই গভীর সংকটের স্থায়ী সমাধান করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।




































