নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক অধিবেশনে তিনি দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশের নতুন যাত্রার কথা তুলে ধরেন। ভাষণের শুরুতে তিনি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পাশাপাশি দেশের দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামে আত্মত্যাগকারী সবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। একই সঙ্গে তিনি দেশবাসীকে গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়ে আনতে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বিশ্বমঞ্চে নিজের পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে ভাষণ দেওয়ার এই বিরল নজির স্থাপন করে তিনি বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দেশপ্রেমের কথা স্মরণ করেন।
ফ্যাসিবাদী আমলের গুম, খুন, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের ক্ষত কাটিয়ে উঠতে বর্তমান সরকার ‘পুনরুদ্ধার, পুনর্বহাল এবং পুনর্গঠন’ বা থ্রি-আর স্ট্র্যাটেজি অনুসরণ করছে বলে বিশ্বনেতাদের জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে শাসনব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রে যে ধস নেমেছিল, তা মেরামত করতে এই তিন কৌশলের বিকল্প নেই। বৈশ্বিক সংঘাত ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে মুদ্রাস্ফীতি ও জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে কূটনীতি ও আলোচনার ওপর বিশেষ জোর দেন তিনি। যেকোনো সংকট উত্তরণে মারণাস্ত্রের বদলে পারস্পরিক সহযোগিতা ও মানবতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান সরকারপ্রধান। এছাড়া পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের পক্ষে বাংলাদেশের অবিচল সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
দীর্ঘ ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ায় দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও নিরাপত্তার ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করেন যে, রোহিঙ্গা সংকটের মূল সমাধান তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে নিরাপদে ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সংকটের সমাধান করতে ব্যর্থ হলে তা বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। তাই বাস্তুচ্যুত এই জনগোষ্ঠীর জন্য জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তাদের অধিকার রক্ষায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে আরও জোরালো ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অগ্রভাগে থাকা বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে দায়বদ্ধ না থেকেও এর চরম শিকার হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন সরকারপ্রধান। পরিবেশ সুরক্ষায় তার সরকার ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, খাল খনন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মতো নানা দূরদর্শী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে বলে তিনি জানান। পাশাপাশি নারী শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, গ্র্যাজুয়েশন পর্যন্ত নারীদের অবৈতনিক শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পরিশেষে, ফ্যামিলি কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডসহ বিভিন্ন কল্যাণমুখী কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের উপযোগী একটি সমৃদ্ধ ও শান্তিময় ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।

































