আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় তা ফ্রান্সে তীব্র অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে। তবে এই আন্তর্জাতিক সংঘাত ফরাসি সংকটের একমাত্র কারণ নয়, বরং দেশটিতে আগে থেকেই জমে থাকা জনরোষে জ্বালানি ঢেলেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ শ্রেণिकক্ষ ও নাগরিক সেবার অবক্ষয়ের প্রতিবাদে ফরাসি শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিল। অল্প সময়ের মধ্যে এই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন। সরকারের হিসাব অনুযায়ী দেশজুড়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিলেও, আন্দোলনটি শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটে রূপ নেয়।
গত সেপ্টেম্বর মাসে প্যারিসের উপকণ্ঠ ক্রোতেইয়ের একটি বিদ্যালয় থেকে এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল এবং মাত্র দশ দিনের মধ্যে তা প্রায় এক হাজার বিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। বিবিসি ও ল্য মোঁদের প্রতিবেদনে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ শিক্ষাদিবস ও শিক্ষকস্বল্পতার মতো নানা সংকটের কথা উঠে এসেছে। পরবর্তীতে শিক্ষার্থী ছাড়াও শিক্ষক, অভিভাবক, শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়ন ও কৃষকরা এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। শিক্ষার সংকট একপর্যায়ে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, স্থবির মজুরি এবং সরকারি সেবার অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা বৃহত্তর অসন্তোষে রূপ নেয়। রাজধানী প্যারিসসহ মার্সেই, লিয়ঁ ও লিমোজোর মতো শহরগুলোর রাজপথে লাখো মানুষ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন।
শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পাশাপাশি মুখোশধারী সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী ও সুযোগসন্ধানী লুটেরারা সরকারি ভবন, দোকান ও যানবাহনে হামলা চালালে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। প্যারিসসহ বিভিন্ন স্থানে বহু গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং দোকানপাট লুট করা হয়। এই সহিংসতা ও ভাঙচুরের ঘটনার ফলে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবিগুলো ঢাকা পড়ে যায় এবং জনপদ পুড়িয়ে শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠন করা সম্ভব নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের ব্যর্থতাও প্রকাশ পায়। প্রায় ষাট হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হলেও অনেক এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লঁর নুনেজ গোয়েন্দা তথ্য ও পূর্বপ্রস্তুতির ঘাটতির দায় স্বীকার করে পদত্যাগের প্রস্তাব দিলেও প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ তা গ্রহণ করেননি। সপ্তাহজুড়ে চলা সংঘর্ষে দুই হাজার তিনশর বেশি মানুষকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং প্রায় এক হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী আহত হয়েছেন।
রাষ্ট্রের সক্ষমতার বৈপরীত্য ফুটিয়ে তুলে সমালোচকরা বলছেন, সংকট মোকাবিলায় সরকার শিক্ষক নিয়োগের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বেশি তৎপরতা দেখিয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে, যার ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ফরাসি সরকারের ওপর সরকারি ঋণের চাপ এবং বাজেট নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা তীব্র হয়েছে। রাজনৈতিক এই বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার ফলে ফরাসি শেয়ারবাজারে পতন ঘটেছে এবং সরকারি বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। একদিকে নাগরিক সেবা উন্নত করার জন্য অর্থের প্রয়োজন, অন্যদিকে ঋণ কমাতে ব্যয়সংকোচনের নীতি গ্রহণ করতে গিয়ে ফরাসি সরকার বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উভয় সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।




































