ঢাকা ০১:২৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ সংবাদ

বাংলা সংস্কৃতি: কৃষ্টি-আত্ম-অপর আখ‍্যান

মতামত ডেস্ক: বাঙালি সংস্কৃতির মূল উৎস ও ভিত্তি নিয়ে লেখক তসলিমা নাসরিনের বিভিন্ন সময়ের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি তাঁর একটি লেখায় দাবি করা হয় যে হিন্দু সংস্কৃতিই বাঙালি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি, যা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা সংশয় ও আপত্তির জন্ম দিয়েছে। বহুত্বকে স্বীকার করার পরেও সংস্কৃতির কোনো একটি বিশেষ ধারাকে ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হলে অন্য ধারাগুলো গৌণ হয়ে যায়। অথচ ইতিহাস বলে বাংলা সংস্কৃতি কোনো একক বৃক্ষ নয়, বরং এটি বদ্বীপের নদীর মতো বিভিন্ন ধারার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা একটি জনপদ।

ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটন এবং নীলেশ বোসের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলার ইসলাম বা বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি কোনো আরবীয় বা উত্তর ভারতীয় আমদানিকৃত পরিচয় নয়। এটি স্থানীয় ভাষা, সাহিত্য, কৃষি সম্প্রসারণ এবং সুফি দর্শনের সঙ্গে দীর্ঘ মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে। একইভাবে বাংলা ভাষার শব্দভান্ডারে ফারসি ও আরবি ভাষার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে যা দৈনন্দিন ব্যবহারের মাধ্যমে সম্পূর্ণ বাংলা ভাষা হিসেবে আত্মীকরণ করা হয়েছে। সংস্কৃতির এই রূপান্তর প্রমাণ করে যে এর ইতিহাস বিশুদ্ধতা খোঁজার কোনো প্রকল্প নয়, বরং এটি পারস্পরিক আদান-প্রদানের নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া।

বাংলার লোকসংস্কৃতি এবং বাউল ঐতিহ্যে বৌদ্ধ সহজিয়া, বৈষ্ণব দর্শন, যোগ-তান্ত্রিক সাধনা ও সুফি চিন্তার যৌথ উপস্থিতি লক্ষ করা যায় যা কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মের কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সুন্দরবনের বনবিবি ঐতিহ্য কিংবা যৌথ পীর-সন্ত উপাসনার মতো বিষয়গুলো দেখায় যে হিন্দু ও মুসলমান লোকবিশ্বাস একে অপরের সঙ্গে মিশে একটি স্বতন্ত্র স্থানীয় জগৎ তৈরি করেছে। নৃতাত্ত্বিক মাসাহিকো তোগাওয়ার মতে, এটিকে নিছক দুটি আলাদা সংস্কৃতির মিশ্রণ বলা চলে না, বরং এটি মানুষের যৌথ সহ-নির্মাণের ইতিহাস।

যখন কেউ বাংলা সংস্কৃতির ভিত্তি হিসেবে ‘হিন্দু সংস্কৃতি’র কথা বলেন, তখন প্রশ্ন ওঠে ঠিক কোন ধারার কথা বলা হচ্ছে, কারণ শাক্ত, বৈষ্ণব, তান্ত্রিক বা লোকায়ত বিশ্বাসের মধ্যে বহু মতপার্থক্য রয়েছে। ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণা অনুযায়ী, হিন্দুধর্মের বহুত্বকে আধুনিক রাজনৈতিক পরিচয়ে রূপ দেওয়ার পেছনে ঔপনিবেশিক জ্ঞানচর্চা ও জনগণনার ভূমিকা রয়েছে। তাই একক কোনো ধর্মকে সংস্কৃতির একমাত্র ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত না করে বাংলার বহুত্ববাদী ও বহুমুখী ইতিহাসকে সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করা উচিত।

জনপ্রিয়

বৈষম্যহীন বিশ্ব গড়তে মহাত্মা গান্ধীর আদর্শ অনুকরণীয়: এ্যানী

বাংলা সংস্কৃতি: কৃষ্টি-আত্ম-অপর আখ‍্যান

প্রকাশিত ১১:২২:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

মতামত ডেস্ক: বাঙালি সংস্কৃতির মূল উৎস ও ভিত্তি নিয়ে লেখক তসলিমা নাসরিনের বিভিন্ন সময়ের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি তাঁর একটি লেখায় দাবি করা হয় যে হিন্দু সংস্কৃতিই বাঙালি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি, যা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা সংশয় ও আপত্তির জন্ম দিয়েছে। বহুত্বকে স্বীকার করার পরেও সংস্কৃতির কোনো একটি বিশেষ ধারাকে ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হলে অন্য ধারাগুলো গৌণ হয়ে যায়। অথচ ইতিহাস বলে বাংলা সংস্কৃতি কোনো একক বৃক্ষ নয়, বরং এটি বদ্বীপের নদীর মতো বিভিন্ন ধারার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা একটি জনপদ।

ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটন এবং নীলেশ বোসের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলার ইসলাম বা বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি কোনো আরবীয় বা উত্তর ভারতীয় আমদানিকৃত পরিচয় নয়। এটি স্থানীয় ভাষা, সাহিত্য, কৃষি সম্প্রসারণ এবং সুফি দর্শনের সঙ্গে দীর্ঘ মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে। একইভাবে বাংলা ভাষার শব্দভান্ডারে ফারসি ও আরবি ভাষার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে যা দৈনন্দিন ব্যবহারের মাধ্যমে সম্পূর্ণ বাংলা ভাষা হিসেবে আত্মীকরণ করা হয়েছে। সংস্কৃতির এই রূপান্তর প্রমাণ করে যে এর ইতিহাস বিশুদ্ধতা খোঁজার কোনো প্রকল্প নয়, বরং এটি পারস্পরিক আদান-প্রদানের নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া।

বাংলার লোকসংস্কৃতি এবং বাউল ঐতিহ্যে বৌদ্ধ সহজিয়া, বৈষ্ণব দর্শন, যোগ-তান্ত্রিক সাধনা ও সুফি চিন্তার যৌথ উপস্থিতি লক্ষ করা যায় যা কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মের কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সুন্দরবনের বনবিবি ঐতিহ্য কিংবা যৌথ পীর-সন্ত উপাসনার মতো বিষয়গুলো দেখায় যে হিন্দু ও মুসলমান লোকবিশ্বাস একে অপরের সঙ্গে মিশে একটি স্বতন্ত্র স্থানীয় জগৎ তৈরি করেছে। নৃতাত্ত্বিক মাসাহিকো তোগাওয়ার মতে, এটিকে নিছক দুটি আলাদা সংস্কৃতির মিশ্রণ বলা চলে না, বরং এটি মানুষের যৌথ সহ-নির্মাণের ইতিহাস।

যখন কেউ বাংলা সংস্কৃতির ভিত্তি হিসেবে ‘হিন্দু সংস্কৃতি’র কথা বলেন, তখন প্রশ্ন ওঠে ঠিক কোন ধারার কথা বলা হচ্ছে, কারণ শাক্ত, বৈষ্ণব, তান্ত্রিক বা লোকায়ত বিশ্বাসের মধ্যে বহু মতপার্থক্য রয়েছে। ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণা অনুযায়ী, হিন্দুধর্মের বহুত্বকে আধুনিক রাজনৈতিক পরিচয়ে রূপ দেওয়ার পেছনে ঔপনিবেশিক জ্ঞানচর্চা ও জনগণনার ভূমিকা রয়েছে। তাই একক কোনো ধর্মকে সংস্কৃতির একমাত্র ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত না করে বাংলার বহুত্ববাদী ও বহুমুখী ইতিহাসকে সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করা উচিত।