ঢাকা ০৭:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

জি ডব্লিউ চৌধুরী: বাংলাদেশকে মেনে নিতে পারেননি যে বাঙালি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী

ডেস্ক রিপোর্ট: প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও কূটনীতিক গোলাম ওয়াহেদ চৌধুরী সম্প্রতি তার স্ত্রীর একটি বিতর্কিত মন্তব্যের সুবাদে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন। তার স্ত্রী দিলারা চৌধুরী সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন যে স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান রেডিও-টেলিভিশনে আজান প্রচার বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তথ্যগতভাবে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এই দাবি আসার পর থেকেই তার স্বামী জি ডব্লিউ চৌধুরীর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতিহাসের ঘটনা মূল্যায়ন এবং সেই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে এই বাঙালি বুদ্ধিজীবীর অবস্থান সবসময়ই একটি বিশেষ আলোচনার বিষয় ছিল।

১৯২৬ সালে মাদারীপুর জেলায় জন্ম নেওয়া গোলাম ওয়াহেদ চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গবেষণা বিভাগের মহাপরিচালক এবং কেন্দ্রীয় সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। পাকিস্তানের সামরিক অভিযানের নৃশংসতার তীব্র সমালোচনা করলেও তিনি পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার পক্ষে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে কখনোই সরে আসেননি।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও চৌধুরী বিশ্বাস করতেন পাকিস্তানের কাঠামোর ভেতরেই সাংবিধানিক উপায়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত তার ‘দ্য লাস্ট ডেজ অব ইউনাইটেড পাকিস্তান’ নামক বইটিতে তার এই অবস্থানের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। সেখানে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও বৈষম্যের কথা স্বীকার করলেও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে সমর্থন করেননি। মূলত শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের মধ্য দিয়েই পাকিস্তানের ঐক্য রক্ষা করা সম্ভব বলে তিনি মনে করতেন।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হওয়ার সময় তিনি লন্ডনে একাডেমিক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সেখান থেকেই পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছিলেন। লন্ডনে বসেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বাঙালিদের ওপর কি ভীষণ নৃশংসতা চালানো হচ্ছে এবং তিনি ইয়াহিয়া খানকে চিঠি লিখে সেই সন্ত্রাস বন্ধের আবেদনও করেছিলেন। পরবর্তীতে করাচিতে গিয়ে তিনি ইয়াহিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের ভয়াবহ পরিস্থিতি স্বচক্ষে দেখার জন্য ঢাকায় আসেন। ঢাকায় এসে সাধারণ মানুষের স্বজন হারানোর বেদনাদায়ক গল্প ও পোড়ামাটি দেখে তিনি মর্মাহত হলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে নিজের অবস্থান নেননি।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর জি ডব্লিউ চৌধুরীর এই ঐতিহাসিক ভূমিকা প্রমাণ করে যে অনেক বাঙালি বুদ্ধিজীবী বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন পাকিস্তানের মোহ পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তার কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মজীবন এবং পরবর্তীতে প্রকাশিত লেখালেখি প্রমাণ করে যে তিনি বাঙালি হয়েও স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম প্রক্রিয়াকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। ইতিহাসের এই জটিল চরিত্রগুলোর মূল্যায়ন আমাদের তাই স্মরণ করিয়ে দেয় যে কেবল শিক্ষাগত যোগ্যতা বা মেধা নয়, সংকটকালে সঠিক রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়াটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

জনপ্রিয়

অষ্টমীর হলুদ শাড়িতে ব্লাউজের রংয়ে পূজার আমেজ

জি ডব্লিউ চৌধুরী: বাংলাদেশকে মেনে নিতে পারেননি যে বাঙালি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী

প্রকাশিত ০৬:০৭:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ডেস্ক রিপোর্ট: প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও কূটনীতিক গোলাম ওয়াহেদ চৌধুরী সম্প্রতি তার স্ত্রীর একটি বিতর্কিত মন্তব্যের সুবাদে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন। তার স্ত্রী দিলারা চৌধুরী সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন যে স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান রেডিও-টেলিভিশনে আজান প্রচার বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তথ্যগতভাবে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এই দাবি আসার পর থেকেই তার স্বামী জি ডব্লিউ চৌধুরীর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতিহাসের ঘটনা মূল্যায়ন এবং সেই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে এই বাঙালি বুদ্ধিজীবীর অবস্থান সবসময়ই একটি বিশেষ আলোচনার বিষয় ছিল।

১৯২৬ সালে মাদারীপুর জেলায় জন্ম নেওয়া গোলাম ওয়াহেদ চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গবেষণা বিভাগের মহাপরিচালক এবং কেন্দ্রীয় সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। পাকিস্তানের সামরিক অভিযানের নৃশংসতার তীব্র সমালোচনা করলেও তিনি পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার পক্ষে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে কখনোই সরে আসেননি।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও চৌধুরী বিশ্বাস করতেন পাকিস্তানের কাঠামোর ভেতরেই সাংবিধানিক উপায়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত তার ‘দ্য লাস্ট ডেজ অব ইউনাইটেড পাকিস্তান’ নামক বইটিতে তার এই অবস্থানের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। সেখানে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও বৈষম্যের কথা স্বীকার করলেও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে সমর্থন করেননি। মূলত শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের মধ্য দিয়েই পাকিস্তানের ঐক্য রক্ষা করা সম্ভব বলে তিনি মনে করতেন।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হওয়ার সময় তিনি লন্ডনে একাডেমিক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সেখান থেকেই পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছিলেন। লন্ডনে বসেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বাঙালিদের ওপর কি ভীষণ নৃশংসতা চালানো হচ্ছে এবং তিনি ইয়াহিয়া খানকে চিঠি লিখে সেই সন্ত্রাস বন্ধের আবেদনও করেছিলেন। পরবর্তীতে করাচিতে গিয়ে তিনি ইয়াহিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের ভয়াবহ পরিস্থিতি স্বচক্ষে দেখার জন্য ঢাকায় আসেন। ঢাকায় এসে সাধারণ মানুষের স্বজন হারানোর বেদনাদায়ক গল্প ও পোড়ামাটি দেখে তিনি মর্মাহত হলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে নিজের অবস্থান নেননি।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর জি ডব্লিউ চৌধুরীর এই ঐতিহাসিক ভূমিকা প্রমাণ করে যে অনেক বাঙালি বুদ্ধিজীবী বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন পাকিস্তানের মোহ পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তার কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মজীবন এবং পরবর্তীতে প্রকাশিত লেখালেখি প্রমাণ করে যে তিনি বাঙালি হয়েও স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম প্রক্রিয়াকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। ইতিহাসের এই জটিল চরিত্রগুলোর মূল্যায়ন আমাদের তাই স্মরণ করিয়ে দেয় যে কেবল শিক্ষাগত যোগ্যতা বা মেধা নয়, সংকটকালে সঠিক রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়াটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।