ডেস্ক রিপোর্ট: খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে বর্তমান ইরাকের মসুল শহরের নিকটবর্তী প্রাচীন নিনেভেহ নগরীতে গড়ে উঠেছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন ও সুবিন্যস্ত লাইব্রেরি। আসিরিয়া সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট আশুরবানিপালের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই রাজকীয় সংগ্রহশালায় কোনো কাগজের বই বা চামড়ার বাঁধাই ছিল না, বরং তাকভর্তি ছিল পোড়া মাটির ছোট ছোট ফলক। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতি অনুযায়ী, সরকারি হিসাব বা দলিলপত্র ছাড়াও সেকালের সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও দর্শনের অমূল্য উপাদান জমা করা হয়েছিল এই ভাণ্ডারে। রাজপরিবারের তৃতীয় সন্তান হওয়ায় উচ্চশিক্ষিত ও পণ্ডিত প্রকৃতির এই শাসক জ্ঞানচর্চাকে তলোয়ারের মতো সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
সম্রাট আশুরবানিপালের সিংহাসনে আরোহণের পর নিনেভেহের প্রশাসনিক আর্কাইভগুলো পূর্ণাঙ্গ আধুনিক লাইব্রেরিতে রূপান্তরিত হয়। তার মূল লক্ষ্য ছিল মানবজাতির অতীতের সমস্ত অর্জিত জ্ঞান এক ছাদের নিচে নিয়ে আসা, যার মধ্যে জ্যোতির্বিদ্যা, ধর্ম, চিকিৎসাবিদ্যা, জাদুবিদ্যা, ইতিহাস ও উপকথা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই বিশাল সংগ্রহশালা গড়ে তুলতে তিনি দক্ষ লিপিকারের বাহিনী নিয়োগ করেছিলেন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করতেন। এমনকি বিজিত এলাকা থেকে গ্রন্থ লুট করা কিংবা বিভিন্ন শহরের পণ্ডিতদের ফরমায়েশ পাঠিয়ে নির্দিষ্ট বইয়ের অনুলিপি পাঠাতে বাধ্য করার মতো কৌশলও তিনি নিয়েছিলেন।
এই প্রাচীন লাইব্রেরির সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক ছিল এর আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও নথিপত্র সংরক্ষণের অনন্য পদ্ধতি। ত্রিশ হাজারেরও বেশি মাটির ফলকের প্রতিটিতে নির্দিষ্ট মেটাডেটা বা কোলফোন যুক্ত ছিল, যা দেখে সঠিক ফাইলে সাজানোর নিয়ম বোঝা যেত। বর্তমান যুগের বারকোডের মতো এই ফলকগুলোতে রাজার মালিকানার সিলমোহর এবং ফলক চুরি বা ক্ষতি করলে দেবতার অভিশাপ নেমে আসার হুঁশিয়ারিও খোদাই করা ছিল। এই লাইব্রেরির সবচেয়ে বড় রত্ন হিসেবে বিবেচিত হয় মানবসাহিত্যের অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন ‘গিলগেমেশ’ মহাকাব্যের ঐতিহাসিক সংস্করণগুলো।
খ্রিস্টপূর্ব ৬১২ অব্দে ব্যাবিলনীয় এবং মেদদের যৌথ আক্রমণে নিনেভেহ নগরীর পতন ঘটলে আগুন ভস্মীভূত করে পুরো রাজপ্রাসাদ। তবে সেই বিধ্বংসী আগুনের তীব্র উত্তাপের কারণেই কাঁচা মাটির ফলকগুলো পুড়িয়ে শক্ত ইটে পরিণত হয়, যা শত শত বছর ধরে মাটির নিচে ধ্বংস হওয়া থেকে সেগুলোকে রক্ষা করে। পরবর্তী সময়ে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ ও স্থানীয় প্রত্নতাত্ত্বিকরা নিনেভের ধ্বংসাবশেষ থেকে এই মাটির ফলকগুলো আবিষ্কার করেন এবং লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে স্থানান্তরিত করেন। আড়াই হাজার বছর আগের এই পোড়া মাটির ফলকগুলো প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বর ও মানবসভ্যতার মূল্যবান বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার হিসেবে আজও জ্বলজ্বল করছে।






































